দিন তারিখ মনে নাই। ঘটনাটি ১৯৯০-এর দশকের । স্কুলে পড়ি। আমাদের বাড়ির অদূরে রাস্তার পাশে একটি শিমুল গাছ ছিল। পাশের বাজারে ২টি বৃহৎ বট গাছ ছিল। ওই গাছে জিন থাকত । এমন রটনার ভয়ে সন্ধ্যার পর সে রাস্তা ব্যবহার করতে ভয় হতো।ওই গাছে শকুন ও থাকত। ঝাঁকে ঝাঁকে শকুন। একদিন গ্রামে কারও গরু মারা গেল। মরা গরুটি ফেলা হল শিমুল গাছের পাশে উচুঁ জায়গায়। শকুনগুলো দু-এক দিনের ব্যবধানে গরুটাকে খেয়ে ফেলল।। আমাদের গ্রামে তখন খোরা রোগে অনেক গরু মারা যেত। মহিষও মারা যেত। তাই শকুনদের খাবারের অভাব হতো নাহ্। তবু শকুনরা তৃপ্ত হতো না কখনোই।
![]() |
| লেখক:মানিক মুনতাসির |
দেখতাম জীবিত গরু মাঠে ঘাস খেতে খেতে কখনো কখনো বিশ্রাম নিতে শুয়ে পড়ত। ঘাড় মাথাও মাটিতে লেফটে দিত। সেই জীবিত গরুর উপর শুকুন দলরা ঝাঁপিয়ে পড়ত। অবশ্য গরু জেগে উঠলে শকুনরা পালিয়ে যেত। আজ ৪ সেপ্টেম্বর ,আন্তর্জাতিক শকুন সচেতনতা দিবস।প্রতি বছর সেপ্টেম্বরের ১ম শনিবার দিবসটি পালিত হয়।গত বছর দিবসটি ছিল ৫ই সেপ্টেম্বর।
এখন তো শকুন এ দেশ থেকে প্রায় বিলুপ্ত । তবে ঘরে ঘরে আপনার আশেপাশে সবখানে মানুষরুপী শকুনের অভাব নাই। এরা ওত পেতে থাকে কখন আপনি বিশ্রামে/ছুটিতে কিংবা চোখের আড়ালে যাবেন। ব্যস এরা আপনার স্থান দখল করার জন্য মরিয়া হয়ে উঠবে। পারুক বা না পারুক। তেলবাজি, চাপাবজি,ধাপ্পাবাজি,যত রকম বাজি আছে সবই খেলবে।অন্যের আসন দখলের চেষ্টা করবে।এখানে অবশ্য অগ্রজদের প্রশ্রয় থাকে অনেক ক্ষেত্রে।
যা হোক,আশেপাশে তাকিয়ে দেখুন শকুন কোথায় আছে।চিনতে পারলে এড়িয়ে চলুন।ফাদঁ এরা পাতরবেই।পা দেওয়া যাবে না।এদের গিফট,সহযোগিতা,সহায়তা,পাওনা,কোন কিছু দিয়ে তৃপ্ত করতে পারবেন না । ফলে এদের এড়িয়ে চলুন। তার চেয়ে বড় কথা ,শকুনের পেট কখনো ভরে না। শকুন সাধারণত চক্ষুর আড়ালে বাসা বাঁধে। মানুষরুপী শকুনরাও একাই স্বভাবের।
শকুন একমাত্র প্রাণী যা রোগাক্রান্ত মৃত প্রাণী খেয়ে হজম করতে পারে এবং অ্যানথ্রাক্স,যক্ষ্মা,খুরা, রোগের সংক্রমন থেকে অবশিষ্ট জীবকুলকে রক্ষা করে।প্রসঙ্গত অ্যানথ্রাক্স আক্রান্ত মৃতদেহ মাটিতে পুতে রাখলেও তা একশ বছর সংক্রমনক্ষম থাকে।তাই শকুন আমাদের বন্ধুও বটে।
প্রাণীখুলে শকৃনের আদিপত্য তা বেশ আগেই থেকে ভেঙ্গে গেছে।এখন এটি শুধু বিলুপ্তির থাকা প্রাণী নয়,একাবারে নিশ্চিহ্ন হওয়ার পথে বলা যায় মাত্র তিন দশক আগে ও কমপক্ষে ১০ লাখ শকুনের বিচরণ ক্ষেত্র ছিল বাংলাদেশের আকাশ জমিন। সে সংখ্যা নেমে আসছে ২৬০-এ। ১৯৯০থেকে ২০১২ সালের মধ্যেই প্রায় ৯৯ শতাংশ শকুন হারিয়ে গেছে বলে মনে করেন বিশেষঅজ্ঞরা দেশে থাকা অল্পসংখ্যাক শকুন রক্ষায় নানা পদক্ষেপ নিয়েছে সরকার। তবে মানুষরুপী শকুনের সংখ্যা বাড়ছে চক্রবৃদ্ধি হারে।সমাজে,ব্যাংকে,চাকরির ক্ষেত্রে,বাড়িতে সর্বত্র মানুষরুপী শকুনের অবাধ বিচরণ।
উইকিপিডিয়ার তথ্যমতে শকুন এ পৃথিবীতে আছে অনেক আগে থেকেই।শকুনেরে সাধারণ একটা বৈশিষ্ট -এদের মাথায় পালক নাই,চঞ্চু খুব ধারালো।এরা ময়লায় ভাগাড় থেকে খাবার খুঁজে খায়।অনেক উপর থেকে মৃত পশুর দেহ দেখতে পাই । তারপর সেখানে নেমে এসে মৃত পশুর দেহ দ্রুত সাবাড় করে। তাদের পাকস্থলীর ধারণক্ষমতা অসাধারণ।মৃত পশুর দেহ ত বটেই,তাদের হাড় পর্যন্ত হজম করে ফেলতে পারে শকুন।
গারা বিশ্বে প্রায় ১৮ প্রজাতির শকুন দেখা যায়। এর মধ্যে পশ্চিম গোলার্ধে সাত আর পূর্ব গোলার্ধে ঈগলের সঙ্গে সম্পর্কিত ১১ প্রজাতির শকুন দেখা যায়। দক্ষিণ এশিয়ায় দেশ বাংলাদেশে প্রায় ছয় প্রজাতির শকুন রয়েছে। এর মধ্যে চার প্রজাতির স্থায়ী আর ২ প্রজাতি পরিযায়ী। শকুন বা বাংলা শকুন ছাড়াও এতে আছে রাজশকুন,গ্রিফন শকুন বা ইউরোপীয় শকুন,হিমালয়ী শকুন ,সরুঠোঁট শকুন,কালা শকুন ও ধলা শকুন।তবে গ্রিফন প্রজাতির শকুন মাঝেমধ্যে দেখা যায় (পরিপ্রেক্ষিত ২০১০)। এসব প্রজাতির শকুনই সারা বিশ্বে বিপন্ন। স্থায়ী প্রজাতির মধ্যে রাজশকুন মহাবিপন্ন। এটি ডিম থেকে বাচ্চা ফোটানোর জন্য ঠোঁটে পাথরের টুকরো বহন করে ও ডিমের উপর নিক্ষেপ করে।
বিবিসির এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে: ১৯৭০ ও ১৯৮০ দশকে শকুনের সংখ্যা এত বেশি ছিল যে ভারত বা পাকিস্তানের মত দেশে শকুনের একটা উপদ্রব গণ্য করা হতো। এগুলো যে সংরক্ষন করা দরকার তা কারো মাথায় আসেনি।দেশ ২টি মনে করত এরা বড় ধরনের উপদ্রব দেখা দিয়েছে। সে সময় সারা পৃথিবীতে সবজচেয়ে বেশি দেখা যেত ওরিয়েন্টাল হোয়াইট রাম্পড ভালচার বা প্রাচ্যদেশীয় সাদা পাকা শকুন । ধারণা করা হয়,১৯৭০-এর দশকে শুরুর দিকে ভারতের জয়পুর-আগ্রা ও দিল্লি মধ্যবর্তী অঞ্চলে কেবল ৪ কোটি এ রখম শকুন ছিল।এখন তা প্রায় বিলুপ্ত ।
তবে সেসব মানুষের ধারণা আজ সত্যিই হয়েছে।মানুশষরুপী শকুন তো সমাজের মধ্যে উপদ্রব হয়ে দেখা দিয়েছে।মানুষরুপী শকুন কত প্রকার তা অবশ্যই বলা মুশকিল।কেননা এ নিয়ে এখনো পর্যন্ত কোন গবেষনা হয়নি।গবেষনা হলে এর প্রজাতির সংখ্যা হয়তো আরো বেশি বলেই জানা যাবে। মানুষরুপী এ শকুনের উপদ্রব থেকে বাচঁতে হলে এদের বিরুদ্ধে গড়ে তুলতে হবে সামাজিক আন্দোলন।
আসুন তা-ই করি। নিপাত যাক মানুষরুপী শকুন। বংশ বাড়ুক পরিবেশকবন্ধু শকুনের।

0 মন্তব্যসমূহ